পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র : বেনারস ঘরানার আরেকটি কণ্ঠ নীরব হলো

২০২৫ সালের ২ অক্টোবর, বেনারস ঘাটে স্তব্ধ হলো এক অমোঘ সুরের ধারা। প্রয়াত হলেন পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র—হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনন্য সাধক, বেনারস ঘরানার সর্বশেষ দিকপালদের একজন। তাঁর মৃত্যুতে সঙ্গীতজগৎ হারালো এক যুগপ্রবর্তক শিল্পীকে, যাঁর কণ্ঠে বেঁচে ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দীর সঙ্গীত ঐতিহ্য, ভক্তি আর শিল্পরস।

হরিহরপুর থেকে বিশ্বমঞ্চে

১৯৩৬ সালের ৩ আগস্ট উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার হরিহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পণ্ডিত মিশ্র। তাঁর প্রথম গুরু ছিলেন বাবা বদ্রী প্রসাদ মিশ্র। পরবর্তীতে তিনি কিরানা ঘরানার উস্তাদ আবদুল ঘনি খানের কাছে তালিম নেন, আর সঙ্গীতচর্চার আরও এক উচ্চ স্তরে পৌঁছান ঠাকুর জয়দেব সিংহের শিষ্যত্বে। খেয়ালের শৃঙ্খলা আর ঠুমরীর আবেগ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তোলেন এক স্বতন্ত্র শৈলী, যার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো গঙ্গাতীরের সুরভি।

পূরব আঙ্গ ঠুমরীর আবেগ

যদিও খেয়াল গানে তাঁর দখল ছিল অনন্য, তবে পূরব আঙ্গ ঠুমরী তাঁকে দিয়েছে অমর খ্যাতি। তাঁর গায়কীতে ফুটে উঠত বোল-বানাও—শব্দ ও আবেগের এমন সূক্ষ্ম উন্মোচন, যেখানে সুর হয়ে উঠত কবিতার সমার্থক। দাদরা, চৈতি, কজরি, হোলির মতো ধারাতেও তিনি একই সঙ্গে শাস্ত্রীয় গভীরতা আর লোকরসের সরলতা মিলিয়ে দিতেন।

তাঁর অ্যালবাম তালিকা যেন এক সাংস্কৃতিক দলিল—রামচরিতমানস, কবীর, সুন্দরকাণ্ড, শিব বিবাহ, স্পিরিট অফ বেনারস, পুরবইয়া চৈতিকজরি ইত্যাদি। এই রেকর্ডিং শুধু তাঁর শিল্পকেই সংরক্ষণ করেনি, বরং বেনারসের কণ্ঠকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বমঞ্চে। পাশাপাশি তিনি সিনেমাতেও কণ্ঠ দিয়েছেন—আরক্ষণমোহল্লা আষি ছবিতে তাঁর গান তাঁকে আরও বিস্তৃত শ্রোতৃসমাজে জনপ্রিয় করে তোলে।

সম্মান ও স্বীকৃতি

তাঁর সঙ্গীতজীবন সমৃদ্ধ হয়েছে অসংখ্য সম্মানে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—শিরোমণি পুরস্কার (মুম্বাই), উত্তরপ্রদেশ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, নওশাদ পুরস্কার, যশভারতী পুরস্কার। ২০০০ সালে তিনি পান সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। ২০১০ সালে পদ্মভূষণ-এ ভূষিত হন এবং ২০২০ সালে অর্জন করেন ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ। প্রতিটি সম্মান ছিল তাঁর শিল্পসাধনা ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি।

জীবনের শেষ অধ্যায়

বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে নানা রোগে ভুগছিলেন পণ্ডিত মিশ্র—কিডনির অসুখ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও বয়সজনিত জটিলতা। শরীর ক্রমে দুর্বল হলেও, তাঁর আত্মা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গীতের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ছিল। অবশেষে ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর, বেনারসের মাটিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন—সেই নগরীতে, যাকে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন সারাজীবন।

চিরন্তন উত্তরাধিকার

পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র ছিলেন শুধু একজন গায়ক নন—তিনি ছিলেন বেনারসের আত্মার প্রতীক। ভক্তি, রসিকতা, মিস্টিক ধ্যান আর শাশ্বত সংস্কৃতির অনুরণন মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সঙ্গীতজগৎ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে মোহিত করে যাবে। তাঁর ঠুমরি, ভজন, খেয়াল আর লোকপ্রাণিত সুর চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে, যেমন অমোঘভাবে বইতে থাকে গঙ্গার স্রোত।

Leave a Comment