বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়।

বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়

 

বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়

 

বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়ঃ

১। উদারা বা মন্দ্র সপ্তক = সা, রা, গা, যা, পা, ধা, না (হসন্ত চিহ্নযুক্ত)।

২। মুদারা বা মধ্য সপ্তক = সা, রা, গা, মা, পা, ধা, না (চিহ্ন বর্জিত) । 

৩। তারা বা তার সপ্তক = র্সা, রা, গা, মা, পা, ধা, না (রেফ চিহ্নযুক্ত)।

৪। আরোহীঃ নীচের সুর থেকে চড়ার দিকে যাওয়াকে আরোহী বলে। যেমনঃ সা, রা, গা, মা, পা, ধা, নি

৫। অবরোহীঃ চড়ার দিক থেকে নীচের সুরে আসাকে অবরোহী বলে। যেমনঃ র্সা, না, ধা, পা, মা, গা, রা, সা

৬। সর্গঃ রাগ বাচক তালবদ্ধ স্বরবিন্যাসকে সরগম্ বলে ।

৭। স্বর : সঙ্গীত উপযোগী শ্রুতি মধুর আওয়াজকে স্বর বলে। স্বর ২(দুই) প্রকার যথা- শুদ্ধস্বর ও বিকৃতস্বর ।

৮। শুদ্ধস্বরঃ সঙ্গীতে অবিকৃত স্বরকে শুদ্ধস্বর বলে। যেমন-সা, রা,গা,মা,পা,ধা, না।

৯। বিকৃতস্বরঃ যে স্বর তার শুদ্ধ অবস্থা থেকে নিন্ম বা উচ্চ গতির দ্বারা কোমল বা তীব্র অবস্থা প্রাপ্ত হয় তাকে বিকৃতস্বর বলে। বিকৃত স্বরকে সচলম্বরও বলা হয়। যেমন- ঝা, জ্ঞা, হ্মা, দা, ণা।

১০। সচলস্বরঃ যে স্বর পরিবর্তিত হতে পারে তাকে সচলম্বর বলে । যেমনঃ রা, গা, মা, ধা, না এই স্বরগুলো শুদ্ধ ও কোমল এই দুই অবস্থাতেই রুপান্তরিত হতে পারে । এ কারণে এগুলোকে স্বচলম্বর বলা হয় । 

১১। অচলস্বরঃ যে স্বর তার নিজ স্থানে স্থির থাকে অর্থাৎ বিকৃতি প্রাপ্ত হয় না তাকে অচলস্বর বলা হয়। যেমনঃ সা, পা

১২। তীব্র স্বরঃ যে স্বর তার শুদ্ধ অবস্থা থেকে উচ্চ গতির দ্বারা পরবর্তী কোন শ্রুতিকে আশ্রয় করে তাকে তীব্রস্বর বলা হয় । তীব্রস্বর, ১ (এক) টি যথাঃ হ্মা ।

১৩। কোমলস্বরঃ যে স্বর তার শুদ্ধ অবস্থা থেকে নিন্ম গতির দ্বারা পরবর্তী কোন শ্রুতিকে আশ্রয় করে তাকে কোমলম্বর বলে। কোমলস্বর ৪ (চার)টি যথাঃ ঝা, জ্ঞা, দা, ণা ইত্যাদি ।

১৪ । গ্রহস্বরঃ যে স্বর থেকে গান আরম্ভ হয় তাকে গ্রহস্বর বলে।

১৫। বাদীস্বরঃ যে স্বরটি রাগে বেশী ব্যবহার হয় তাকে বাদীস্বর বলে। ১৬। সমবাদীস্বরঃ যে স্বর রাগে বাদীস্বরের পরই প্রধানভাবে প্রতীয়মান হয়, তাকে সমবাদীস্বর বলে।

১৭। অনুবাদীস্বরঃ বাদীস্বর ও সমবাদীস্বর বাদ দিয়ে রাগে যে বাকী স্বরগুলো রাগ প্রকাশ করতে সহায়তা করে, তাকে অনুবাদীস্বর বলে ।

১৮। বিবাদীস্বরঃ যে স্বর ব্যবহার করলে রাগের রুপ বিনষ্ট প্রায় হয়, তাকে বিবাদীস্বর বলে। আবার অনেক সময় রাগের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যও বিবাদীস্বর প্রয়োগ করা হয়।

১৯। বর্জিতস্বরঃ রাগে যে স্বর ব্যবহার করা হয় না, তাকে বর্জিতস্বর বলে।

২০। বক্রস্বরঃ আরোহীতে কোন স্বর যখন তৎপরবর্তী উঁচু স্বরে সোজা না গিয়ে পরবর্তী নিচু কোন স্বরকে আশ্রয় করে যায়, তখন সে স্বর আরোহীতে বক্র হয় । যথাঃ মা, পা, ধা, না, ধা, সা এ ক্ষেত্রে আরোহীতে নিষাদ (নি) বক্র।

আবার অবরোহীতে কোন স্বর যখন তৎপূর্ববর্তী নিচু স্বরে সোজা না নেমে পরবর্তী উঁচু কোন স্বরকে আশ্রয় করে যায়, তখন সে স্বর অবরোহীতে বক্র হয়। যথাঃ পা, মা, গা, মা, রা, সা। এ ক্ষেত্রে অবরোহীতে গান্ধার (গা) বক্র।

২১। ন্যাসস্বরঃ যে স্বরে গান শেষ হয়, তাকে ন্যাস স্বর বলে ।

২২ । সন্ন্যাসস্বরঃ যে স্বরে গানের প্রথম ভাগ শেষ হয়, তাকে সন্ন্যাস স্বর বলে ।

২৩। স্পর্শস্বর বা কণস্বরঃ একটি স্বর উচ্চারণ করার সময় অন্য একটি স্বরকে সামান্যভাবে ছুঁয়ে উচ্চারণ করলে শেষের স্বরকে স্পর্শস্বর বা কস্বর বলে। যেমনঃ পা, গা ইত্যাদি । কণ দুই প্রকার যথা- পূর্বলগন কণ ও অনুলগন কণ ।

২৪। পুর্বলগন কণঃ কোন মুখ্য স্বর বলার সময় যখন অন্য কোন স্বর স্পর্শ করতে হয় তাকে পূর্বলগন কণ বলে ।

২৫ । অনুলগন কণঃ মূখ্য স্বরের শেষে কোন স্বর স্পর্শ করা হলে তাকে অনুলগন কণ বলে ।

২৬। আগন্তুকস্বরঃ রাগের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির কারণে শাস্ত্রীয় নিয়ম বর্হিভূত যে স্বরটিকে অবরোহীতে কৌশলে ব্যবহার করা হয়, সেই স্বরটিকেই আগন্তুক স্বর বলে ।

২৭। অবন্যাসম্বরঃ গানের অংশের প্রারম্ভে যে স্বর ব্যবহারের করা হয় তাকেই অপন্যাস স্বর বলে।

২৮। অংশস্বরঃ যে স্বর রাগে বার বার ব্যবহার হয়, তাকে অংশস্বর বলে। এর অন্য নাম জীবস্বর । জীব অর্থ জান বা প্রাণ। তাই অংশস্বরকে রাগের প্রাণ বলা হয় ।

২৯। আলঙ্কারিক স্বরঃ যে স্বর অন্য একটি স্বরের শ্রুতি মাধুর্য সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং নিজে কোন প্রকার প্রাধান্য লাভ করে না তাকে আলঙ্কারিক স্বর বলা হয়। গান্ধারকে সামান্য স্পর্শ করে যদি মধ্যমে যাওয়া যায় এবং এইভাবে যাওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় মধ্যমের ব্যবহারের সৌন্দর্য সাধন তা হলে এই স্থলে গান্ধার আলঙ্কারিক স্বর রুপে বিবেচিত হবে।

৩০। ইষ্টস্বরঃ যে মুহুতে যে স্বর প্রয়োগ উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় তাকে ইষ্টস্বর বলা হয় ।

৩১। গুপ্তস্বরঃ যে স্বর অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে রাগে ব্যবহৃত হয় এবং যার প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন এবং শিক্ষা সাপেক্ষ তাকে গুপ্তস্বর বলে ।

৩২। বৈদিকস্বরঃ বেদ গানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যে স্বর সাধনার প্রবর্তন হয় তাকে বৈদিকস্বর বলা হয়।

৩৩। স্থানস্বরঃ উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত এই তিন বৈদিক স্বরকে স্থানস্বর বলা হয় । এগুলো প্রকৃতপক্ষে ত্রিস্থান অর্থাৎ মন্ত্র, মধ্য ও তার প্রভৃতি স্থান নিদের্শক। তাই এদের স্থানস্বর বলা হয়।

৩৪। লৌকিকম্বরঃ বৈদিক সঙ্গীতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রাক আর্যযুগে উদ্ভূত দেশী সঙ্গীতের ও উন্নতির ধারা অব্যাহত থাকে। এই দেশী বা লৌকিক সঙ্গীতে প্রযুক্ত স্বর সমূহকে লৌকিকস্বর নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন- সা, রা, গা, মা, পা, ধা, না প্রভৃতি সাতটি স্বরকে লৌকিকম্বর বলা হয় ।

৩৫ । তারঃ রাগে ব্যবহৃত উচ্চতম স্বরের শেষ সীমারেখাকে তার বলে ।

৩৬। মন্ত্রঃ রাগে ব্যবহৃত নিন্মতম স্বরের শেষ সীমারেখাকে মন্ত্র বলে ।

৩৭। সার্গামগীত বা স্বরমালিকাঃ “কথা ও সুর” এই দুটি মিলে যেমন গান হয়, তেমনি সা, রা, গা, মা, পা বা স্বর উচ্চারণ করেও গান হতে পারে। মোট কথা রাগের রুপ বজায় রেখে রাগে ব্যবহৃত স্বরগুলোকে তাল, মাত্রা ও লয়ে সাজিয়ে গাওয়াকেই সাগামগীত বা স্বরমালিকা বলে।

৩৮। লক্ষণগীতঃ রাগের বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত গানকে লক্ষণগীত বলে । অর্থাৎ যে গানে রাগের ঠাট, জাতি, স্বর, বাদী, সমবাদী, সময় ইত্যাদি বর্ণনা থাকে এবং রাগের রুপ সম্পূর্ণ বজায় রেখে গাওয়া গানটিকে ঐ রাগের লক্ষণগীত বলা হয়।

৩৯ । রাগঃ ঠাট হতে রাগের উৎপত্তি। আরোহী-অবরোহী, আলাপ-বিস্তার, মীড়, মুর্ছনা, গমক ও তানাদি সম্বলিত মনোরঞ্জক ধ্বনিকে “রাগ” বলে। রাগ তিন প্রকার । যথাঃ শুদ্ধ, ছায়ালগ ও সংকীর্ণ।

৪০। শুদ্ধ রাগঃ যে রাগ শাস্ত্রীয় নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণ শুদ্ধভাবে গাওয়া হয় তাকে শুদ্ধ রাগ বলা হয়। যেমন- বিলাবল ।

৪১। ছায়ালগ রাগঃ যে রাগ কোন শুদ্ধ রাগের সামান্য ছায়া অবলম্বনে গাওয়া হয় , তাকে সালংক বা ছায়ালগ রাগ বলা হয়। যেমনঃ ছায়ানট ।

৪২। সংকীর্ণ রাগঃ শুদ্ধ ও ছায়ালগ রাগের সংমিশ্রনে যে সমস্ত রাগ গাওয়া হয় তাকে সংকীর্ণ রাগ বলা হয়। যেমন-পিলু !

৪৩। জনক রাগ বা আশ্রয় রাগঃ হিন্দুস্থানী পদ্ধতি অনুসারে যাবতীয় রাগগুলোকে কোন না কোন একটি ঠাটের অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক ঠাটেরই এমন একটি রাগ আছে, যার নাম ঠাটের নামানুসারে রাখা হয়েছে। সেটাই “আশ্রয় রাগ”। যেমনঃ ঠাট-বিলাবল, রাগ-বিলাবল ।

৪৪। জন্য রাগঃ ঠাট হতে উৎপন্ন আশ্রয় রাগ বা প্রধান রাগ ছাড়া বাকী সব রাগই “জন্য রাগ” ।

৪৫। পকড়ঃ রাগে বিশিষ্ট রুপ প্রকাশক দুটি বা তিনটি স্বর বিস্তার বা বিন্যাসকেই ‘পকড়’ বলে। যেমনঃ ইমন রাগের পকড়- না রা, গা রাসা, পা ক্ষা গা, রাসা।

৪৬। সঙ্গীত পদ্ধতিঃ সমগ্র উপমহাদেশীয় সঙ্গীতে দুই প্রকার পদ্ধতি প্রচলিত আছে । উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্থানী সঙ্গীত পদ্ধতি ও দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীত পদ্ধতি। অর্থাৎ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, যে সঙ্গীত পদ্ধতি প্রচলিত আছে তাকে উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্থানী সঙ্গীত পদ্ধতি বলে। কেবলমাত্র মাদ্রাজ, মহীসূর, অন্ধ ও কর্ণাটকে যে সঙ্গীত পদ্ধতি প্রচলিত আছে তাকে দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীত পদ্ধতি বলা হয় ।

৪৭। বিন্যাসঃ গানের প্রতিটি বিভাগের স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগের প্রথম চরণটি যে স্বরের উপর শেষ হয়, তাকে বিন্যাস বলে।

৪৮। অলংকারঃ স্বর সাধনার বিভিন্ন পদ্ধতিকে অলংকার বলে। তাছাড়া গানে মীড়, গমক, আশ থাকলে সেটা সঙ্গীতে অলংকারের মত শোভা বর্ধন করে সে জন্য এগুলোও রাগের অলংকার ।

৪৯। মীড়ঃ এক স্বর হতে দুই, তিন বা চার স্বর দূরবর্তী অন্য স্বরে অবিচ্ছেদ্যভাবে গড়িয়ে যাওয়া বা আসাকে ‘মীড়’ বলে। যেমন- সা মা।

৫০। পুকারঃ স্বর সপ্তকগুলোর অন্তর্গত এক অথবা আরও বেশী স্বর উচ্চারণকে ‘পুকার’ বলে। যেমন- সর্সা, ররা, গর্গা, ররা, গগা, সসা ইত্যাদি।

৫১। অঙ্গঃ সপ্তকের ৭টি স্বর বা অক্টেভের ৮টি স্বরকে রাগের বাদীস্বরের প্রয়োগের কারণে যে আঙ্গিক বিভাজন করা হয় তাকেই অঙ্গ বলা যেতে পারে। অঙ্গ দুই প্রকার । যথা- পূর্বাঙ্গ ও উত্তরাঙ্গ । (ক) পূর্বাঙ্গঃ সপ্তক বা অক্টেভের প্রথম ভাগকে পূর্বাঙ্গ বলে ।

অর্থাৎ যে রাগের বাদীস্বর সা থেকে মা পর্যন্ত (মতান্তরে পা পর্যন্ত) এর যে কোন একটি স্বরে অবস্থান করে তাকে পূর্বাঙ্গ রাগ বলে। যেমন- রাগ ইমন, বাদীস্বর গা। (খ) উত্তরাঙ্গঃ সপ্তক বা অক্টেভের দ্বিতীয় ভাগকে উত্তরাঙ্গ বলে।

অর্থাৎ যে রাগের বাদীস্বর পা থেকে সা পর্যন্ত (মতান্তরে মা থেকে) এর যে কোন একটি স্বরে অবস্থান করে তাকে উত্তরাঙ্গ রাগ বলে। যেমন-রাগ-বিলাবল, বাদীস্বর-ধা। উল্লেখ্য যে, পন্ডিত ভাতখন্ডেজীর মতে দিবা ১২টা থেকে রাত্রি ১২টার মধ্যে যে সমস্ত রাগ গীত বা বাদিত হয়, সে সমস্ত রাগ পুর্বাঙ্গ রাগ প্রধান এবং রাত ১২টা থেকে দিবা ১২টা পর্যন্ত যে সমস্ত রাগ গীত বা বাদিত হয় তাকে উত্তরাঙ্গ রাগ প্রধান বলে।

৫২। মূচ্ছর্নাঃ সপ্তকের যে কোন স্বর থেকে শুরু করে ক্রমানুসারে পরবর্তী স্থানের অনুরুপ স্বরের সাহায্যে আরোহী অবরোহী দেখানোকেই মূর্ছনা বলা হয়। যেমন- রগা, মপা, ধনা, সরা। রসা নধা পমা গরা, সা রগা মপা ধনা। নধা পমা গরা সা ।

৫৩। গিটকিরি তানঃ দ্রুত লয় বিশিষ্ট সরল ও ছোট তানকে গিটকিরি তান বলা হয়। গিটকিরী দু প্রকার যথাঃ (১) সাদা গিটকারী- ক্রমান্বয়ে তিনম্বরে গিয়ে আবার দ্বিতীয় স্বরে ফিরে আসাকে সাদা গিটকিরী বলে। যেমন সরগরা, রগমগা, গমপমা ইত্যাদি। (2) সগম গিটকিরী- দ্রুত লয়ে কোন স্বর দু’বার বলে দূরবর্তী অন্য একটি স্বর দু’বার উচ্চারণ করলেই তাকে সগম গিট্‌কারী বলা হয়। যেমন- সসগগা, ররমমা, গগপপা ইত্যাদি।

৫৪। তানঃ রাগে ব্যবহৃত স্বরসমূহের বিভিন্ন রচনাকে আকার সহযোগে দ্রুতগতিতে গাইলে তাকে তান বলে। তান বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। যথা- শুদ্ধ তান, সরল বা সপাট তান, কূটতান, মিশ্রতান, ছুটতান, গমকতান, আলঙ্কারিক তান, বক্রতান, ফিরততান, বোলতান, ইত্যাদি

৫৫। শুদ্ধ, সরল বা সপাট তানঃ যে তান রাগের আরোহী, অবরোহী ব্যবহৃত স্বরের ক্রমানুসারে হয় তাকে শুদ্ধতান বলে। ইহাকে সরল বা সপাট তানও বলা হয়। যেমন- সরা, গপা, ধর্মা, বর্গা, বসা, ধপা, গরা, সসা।

৫৬। কূটতানঃ যে তান সরলভাবে না হয়ে কূটগতিতে হয়ে থাকে তাকে কূটতান বলে। যেমন-সপা, রমা, গপা, রগা, রমা, গরা, সা। সঙ্গীত রত্নাকরের মতে কূটতান ৭ (প্রকার) যথাঃ আর্চিক, গাথিক, সামিক, স্বরাস্তক, ঔড়ব, ঘাড়ব এবং সম্পূর্ণ ।

১ (এক)টি স্বরের তানকে আর্চিক, ২(দুই)টি স্বরের তানকে গাথিক, ৩ (তিন)টি স্বরের তানকে সামিক, ৪(চার)টি স্বরের তানকে স্বরান্তক, ৫(পাঁচ)টি স্বরের তানকে ঔড়ব, ৬(ছয়) টি স্বরের তানকে ষাড়ব এবং ৭(সাত)টি স্বরের তানকে সম্পূর্ণ তান বলা হয়। একটি মূর্ছনায় কূটস্তানের সংখ্যা হতে পারে মোট ৫০৪০টি, অতএব ৫৬টি মূর্ছনায় কূটতানের সংখ্যা হয়, ২৮,২০,২৪০ । এই ভাবে শাস্ত্রানুযায়ী মোট ৪৮ কোটি তান তৈরী হতে পারে।

৫৭। মিশ্রতানঃ শুদ্ধ ও কূটতানের সংমিশ্রণে যে তান রচিত হয়, তাকে মিশ্রতান বলে। যেমন- সরা, গপা, ধপা, গরা, গপা, গরা, সরা, রসা।

৫৮। ছুটতানঃ যখন তারা সপ্তকের কোন স্বরে অল্প থামিয়া ঐ স্বর হতে অবরোহীক্রমে দ্রুতগতিতে নেমে আসা হয় তাকে ছুটতান বলে। যেমন-গা-গরা, সনা, ধপা, মগা, রসা।

৫৯। গমকতানঃ গমক সহকারে যে তান গাওয়া হয়, তাকে গমক তান বলে । যেমন-সসা, মমা, রসা, সসা, ময়া, পপা, মমা, রসা। 

৬০। আলঙ্কারিক তানঃ যে তান অলংকারের মত রচনা করে গাওয়া হয় তাকে আলঙ্কারিক তান বলে। যেমন- সঞ্জমা, জমদা, মদনা, দশসা ।

৬১। বক্রতানঃ যে তার বক্রভাবে রচনা করে গাওয়া হয়, তাকে বক্রতান বলে । যেমন-সগা, সমা, গপা, মধা, পদ্মা, গমা, গরা।

৬২। ফিরত তানঃ একই স্বরকে বিভিন্ন প্রকারে প্রয়োগ করাকে ফিরত তান বলে । যেমন- নূরা, গরা, গক্ষা গরা, গহ্মা পক্ষা গরা । 

৬৩। বোলতানঃ গানের কথা তানের মাধ্যমে উচ্চারিত হলে তাকে বোলতান মবলে। তান ও বোলতান সাধারণত খেয়াল গানে ব্যবহৃত হয়। যেমন- মগা -পক্ষা ধপা আপা । সনা ধপা মমা রসা মী0 00 ৩০ পি বাo 

৬৪। পালট বা পাল্টা তানঃ তানে আরোহী হতে সরাসরি অবরোহী করাকেই বলা হয় পালট বা পাল্টা তান। যেমন-সর্না, ধপা, মগা, রসা।

৬৫। হলক তানঃ জিহ্বার ভিতর এবং বাইরে ক্রম সঙ্কালন দ্বারা যে তান করা হয় তাকে বলা হয় হলক তান ।

৬৬। খট্‌কা তানঃ থেমে থেমে বা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে স্বরগুলো উচ্চারণ করা হলে সেগুলোকে খট্‌কা তান বলে

৬৭। সরোক তানঃ চারটি করে স্বর এক সঙ্গে উচ্চারণ করলে সরোক তান হয়। যেমন-সরগমা, রগমপা ইত্যাদি।

৬৮। অচরোক তানঃ একই স্বরকে দুইবার উচ্চারণ করে যে তান করা হয় তাকে বলা হয় অচরোক তান। যেমন- সসা, ররা, গগা, মমা ইত্যাদি ।

৬৯। লড়ন্ত তানঃ সরল এবং আড়ী লয়ের মিশ্রণজাত তানকে বলা হয় লড়ন্ত তান। যেমন-সরা, সরা গগগগা, সা সা সসসসা ।

৭০। ঝটকা তানঃ দুগুন লয়ের তান কিছুটা দু’গুনে করে বাকী অংশ চৌগুনে শেষ করলে তাকে বলে ঝটুকা তান । যেমন-সরা, গমা, পধা, না, নিপা, মগরসা।

৭১। গমকঃ মধুর ও গাম্ভীর্যের সহিত কোন স্বরকে বিশেষভাবে দুলাইয়া উচ্চারণ করার নাম গমক । বর্তমান কালে এক স্বর থেকে অন্য স্বরে আরোহী বা অবরোহী কালে নাভিমূল থেকে উত্থিত আন্দোলিত স্বর-বিন্যাসকে ‘গমক’ বলা হয়।

যেমন- সা০০০, রা০০০, গা০০০, মা০০০ ইত্যাদি। প্রাচীনকালে কারো মতে উনিশ, কারো মতে বাইশ, কারো মতে পনেরো রকমের গমক প্রচলিত ছিল। যেমন- স্ফুরিত, কম্পিত, চ্যাপিত, আহত, আন্দোলিত, মুদ্রিত, প্লাবিত, নামিত, গুস্মিত, লীন, বলি, কুরুল, ত্রিভিন্ন, তিরিপ ও উল্লাসিত

৭২। স্ফুরিত গমকঃ দ্রুতের (অর্থাৎ ক, চ, ত, ট, প উচ্চারণে যে সময় লাগে তার অর্ধেক কাল) তৃতীয়াংশ পরিমিতি বেগে আন্দোলিত গমককে স্ফুরিত গমক বলা হয় । আজকালকার গিটকারী, মুর্কি, জমজমা ইত্যাদি এই গমকের অর্ন্তগত।

৭৩। কম্পিত গমকঃ দ্রুতের অর্ধেক সময়ের মধ্যে স্বরকম্পন করাকে কম্পিত গমক বলা হয়। বাদ্যযন্ত্রে এই গমক হলো এক আঘাতে একই সঙ্গে দু’টি স্বর খুব দ্রুতভাবে প্রকাশ করা। 

৭৪। চ্যাবিত গমকঃ স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য স্বরের সৃষ্টি হলে সেই স্থানচ্যুত স্বরকে চ্যাবিত গমক বলে ।

৭৫। আহত গমকঃ কোন মূল স্বরকে প্রকাশ করার সময়, তার আগের বা পরের স্বরের সাহায্যে ঝটকা মেরে মূল স্বর বাজানোকে আহত গমক বলে ।

৭৬। আন্দোলিত গমকঃ দ্রুত স্বরকম্পনের নাম আন্দোলিত গমক ।

৭৭। মুদ্রিত গমকঃ মুখব্যাদান না করেই যে গমকের সৃষ্টি হয় তাকে মুদ্রিত গমক বলে।

৭৮। প্লাবিত গমকঃ একটি স্বর থেকে আরেকটি স্বর পর্যন্ত ঘর্ষণ করে যাওয়ায় নাম প্লাবিত গমক । তারের বাদ্যযন্ত্রের এই ক্রিয়াকে সুত বা ঘসীট বলে ।

৭৯। নামিত গমকঃ মন্দ্রস্থানে অনুষ্ঠিত কম্পন ক্রিয়াকে নামিত গমক বলা হয়। ৮০। গুক্ষিত গমকঃ হৃদয় থেকে যে কম্পন ধ্বনি উঠে আসে তাকে গুক্ষিত গমক বলে।

৮১। লীন গমকঃ আন্দোলিত গমকের মতো স্বরকম্পন ক্রিয়াকে লীন গমক বলা হয়।

৮২। বলি গমকঃ এই গমকের স্বরগুলো বক্রভাবে দ্রুত প্রকাশ করা হয় বলে এর নাম বলি গমক।

৮৩। কুরুল গমকঃ বলি গমকের মতো কম্পন ক্রিয়ার নাম কুরুল গমক ।

৮৪। ত্রিভিন্ন গমকঃ একই স্বর বা তার বেশী স্বর যখন দ্রুত গতিতে তিন সপ্তকে দেখানো হয় তখন তাকে বিভিন্ন গমক বলে । 

৮৫। তিরিপ গমকঃ দ্রুতের চতুর্থাংশ সময়ের মধ্যে স্বরকম্পন ক্রিয়াকে তিরিপ গমক বলে ।

৮৬। উল্লাসিত গমকঃ এক স্বর থেকে অন্যস্বরের আরোহণকালে যে কম্পন ক্রিয়া করা হয় তাকে উল্লাসিত গমক বলা হয় ।

৮৭। স্থায়ঃ রাগ পরিবেশনকালে যে ছোট ছোট স্বরসমষ্টি দ্বারা স্বরবিস্তার করা হয়, তাকে স্থায় বলা হয় ।

৮৮। নাদঃ ন অক্ষরে প্রাণ ও দ অক্ষরে অগ্নি বোঝায়। প্রাণ ও অগ্নির সংযোগ উদ্ভুত ধ্বনিকে নাদ বলে হয়। নাদ দুই প্রকার। যথা- আহত নাদ ও অনাহত নাদ ।

৮৯। আহত নাদঃ যে নাদ আঘাত দ্বারা স্থূলভাবে উৎপন্ন তাকে আহত নাদ বলা হয়। আহত নাদই সঙ্গীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিন্তু যে কোন প্রকার আহত নাদই সঙ্গীতোপযোগী নয় । একমাত্র যে প্রকার আহত নাদের ঝংকার ও অনুরণনের ধর্মে কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে আনন্দ দান করার গুণ আছে।

তাই সঙ্গীতোপযোগী আহত নাদ। আহত নাদ ২(দুই) প্রকার যথাঃ ১) বর্ণাত্মক-কন্ঠ দ্বারা গান গাওয়া, আবৃত্তি করা, বই পাঠ করাকে বর্ণাত্মক নাদ বলে। ২) ধ্বন্যাত্মকঃ কোন বস্তুর দ্বারা অন্য কোন বস্তুর উপর আঘাত করলে যে নাদের উৎপন্ন হয় তাকে ধ্বন্যাত্মক নাদ বলে।

 

বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়
বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়

 

৯০। অনাহত নাদঃ যে নাদ বিনা আঘাতে স্বতঃই অবিরামভাবে উদ্ভূত তাকে অনাহত নাদ বলা হয়। একমাত্র যোগীগণই বিশেষ স্তরে অনাহত নাদ শ্রবণে সমর্থ হন।

৯১। তুঃ গানের পদ বা কলিকে তুক্ বলে। শাস্ত্রমতে তুক্ চার প্রকার। যথা- স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বেশীর ভাগ স্থায়ী ও অন্তরা এ দুটি কলি বা তুক থাকে। তবে ধ্রুপদ গানে চারটি তুকেরই প্রয়োজন হয় ।

৯২। বর্ণঃ গানের যে ক্রিয়ার দ্বারা রাগের স্বরুপ বিকাশিত হয়, তাকে বর্ণ বলে। এক কথায় গানের ক্রিয়াকেই বর্ণ বলে। বর্ণ চার প্রকার যথা- স্থায়ী বর্ণ, আরোহী বর্ণ, অবরোহী বর্ণ ও সঞ্চারী বর্ণ।

ক) স্থায়ী বর্ণঃ একই সুর একাধিকবার উচ্চারিত বা বাদিত হলে, সেই ক্রিয়াকে স্থায়ী বর্ণ বলে। যেমন- সা সা সা রা রা রা, গা গা গা ইত্যাদি।

(খ) আরোহী বর্ণঃ নীচু সুর থেকে উঁচু বা চড়ার দিকে গীত বা বাদিত হলে সেই ক্রিয়াকে আরোহী বর্ণ বলে। যেমন- সারা গা মা পা ধা না ইত্যাদি।

(গ) অবরোহী বর্ণঃ উঁচু বা চড়া সুর থেকে নিচের দিকে গীত বা বাদিত হলে, সেই ক্রিয়াকে অবরোহী বর্ণ বলে। যেমন- না, ধা, পা, মা, গা, রা, সা ইত্যাদি।

(ঘ) সঞ্চারী বর্ণঃ স্থায়ী, আরোহী ও অবরোহী এই তিন বর্ণের সমন্বয়ে যে ক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়ে, তাকে সঞ্চারী বর্ণ বলে। যেমন- সসা, রগা, পা, মগা, রগা, মপা, ধনা, মপা, ধনা, সা ইত্যাদি।

৯৩। আশঃ অবিচ্ছিন্নভাবে স্বরের উচ্চারণ পর পর হলে তাকে আশ বলে।

৯৪। অম্লত্বঃ কোন রাগ পরিবেশন করবার সময় সেই রাগে ব্যবহৃত স্বরগুলোর সমান গুরুত্ব থাকে না। রাগে কোনও স্বরের স্বল্প প্রয়োগ হলে তাকে বলা হয় অম্লত্ব । অম্লত্ব ২(দুই) প্রকার যথাঃ ক) লঙ্ঘনমূলক অম্লত্ব লঙ্ঘন অর্থে ডিঙিয়ে যাওয়া।

কোন কোন রাগে একটি স্বর অতিক্রম করে পরবর্তী স্বরে যাওয়া হয়, কিন্তু সেই স্বরটি বর্জিত নয়। যেমন- জৌনপুরী রাগে কোমল গান্ধার (জ্ঞা) কিংবা দেশ রাগেতে শুদ্ধ গান্ধার (গা) স্বপ্ন দুটি আরোহী লঙ্ঘন করে গেলেও অবরোহীতে দুর্বলভাবে ব্যবহৃত হয়।

কাজেই গান্ধার স্বরটিকে লঙ্ঘন মূলক অল্পত্বের উদাহরণ বলা চলে। খ) অনভ্যাসমুলক অম্লত্ব- কোন কিছুর অনিয়মিত ব্যবহার বা প্রয়োগকে অনভ্যাস বলা হয়। রাগে এমন কয়েকটি স্বর থাকে যেগুলো খুব কম প্রযুক্ত হয়, অর্থাৎ যেগুলোর প্রয়োগাধিক্য তো ঘটেই না বা সেগুলোর উপর ন্যাস করাও যায় না। এই ধরণের স্বরগুলোর অনভ্যাসমূলক অল্পত্বের আওতায় পড়ে, যেমন- বিহাগ রাগের রেখাব (রা) ও ধৈবত (ধা)।

৯৫। বহুত্বঃ রাগে কোন স্বরের বহুল প্রয়োগকে বলা হয় বহুত্ব। বহুত্বকেও দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে যথাঃ ক) অলঙ্ঘনমূলক বহুত্ব- অলঙ্ঘন অর্থে অনতিক্রম অর্থাৎ ডিঙ্গিয়ে বা এড়িয়ে না যাওয়া। রাগে ব্যবহৃত যে সকল স্বরগুলোকে আরোহী বা অবরোহী কোনমতেই লঙ্ঘন করা যায় না।

অথচ তাদের উপর ন্যাসও করা চলে না। সেই স্বরগুলোকে বলা হয় অলঙ্ঘনমূলক বহুত্ব। যেমন- ইমনের তীব্র মধ্যম (হ্মা) স্বরটি আরোহীতে ব্যবহার করতেই হবে অথচ এই স্বরটিতে ন্যাস করা চলবে না।

খ) অভ্যাসমূলক বহুত্ব- রাগের রূপ পরিস্ফুটন তথা রম্ভকতা বৃদ্ধির জন্য যে স্বরকে বারংবার প্রয়োগ করা হয় বা যার উপর ন্যাস করা হয় তাকে বলা হয় অভ্যাসমূলক বহুত্ব । এই সংজ্ঞানুযায়ী বাদী সমবাদীসহ সকল ন্যাস স্বরই অভ্যাসমূলক বহুত্বের মধ্যে পড়ে।

যেমন- হিন্দোলে বাদী স্বর ধৈবতের (ধা) অভ্যাসমূলক প্রয়োগাধিক্য ঘটে, কিন্তু বাগেশ্রীর ধৈবত (ধা) কিংবা পরজের নিষাদ (নি) বাদীস্বর না হলেও অন্যতম স্বর বলে এই দুটি স্বর অভ্যাসমূলক বহুত্বের সংজ্ঞা পড়বে ।

৯৬। রাগমালাঃ যে গানের রচনাবলীর বিভিন্ন তুক্ বা কলিতে বিভিন্ন রাগের পরিচয় বর্ণিত হয়, তাকে রাগমালা বলে। তবে তাল একই থাকবে ।

৯৭ । প্রবন্ধঃ একই রাগে নিবন্ধ কোন গানের বিভিন্ন তুক্ বা কলিতে বিভিন্ন তাল ব্যবহৃত হলে তাকে ‘প্রবন্ধ’ বলে।

৯৮। বাগ্যেয়কারঃ যে ব্যক্তি একাধারে বাণী ও গীত সম্পর্কে উত্তমরূপে অভিজ্ঞ তাকে ‘বাগ্যেয়কার’ বলা হয়।

৯৯। প্রকীর্ণঃ গানের বিধি প্রণালী, লক্ষণ, প্রয়োগ, ব্যবহারিক শব্দ এগুলোকে ‘প্রকীর্ণ’ বলে ।

১০০। আলাপঃ রাগ সঙ্গীতের প্রথমে রাগ রুপ গেয়ে দেখানোকেই “আলাপ” বলে । এতে রাগের পূর্ণরূপ পুরাপুরি প্রকাশ পায়। কণ্ঠ সঙ্গীতে তানা, নে, রি, রে, তোম্, নোম, ইত্যাদি, অর্থহীন শব্দ আলাপে ব্যবহার হয়, এতে তাল যন্ত্র নিষ্প্রয়োজন ।

২০১। বোল আলাপঃ গান শুরু হওয়ার পর তালের ঠেকার সঙ্গে পদের সাহায্যে আলাপ করাকে ‘বোল আলাপ’ বলা হয়। বোল বিস্তারকেই বোল আলাপ বলে ।

১০২। বিস্তারঃ রাগের স্থায়ী ও অন্তরা গাইবার পর, রাগে ব্যবহৃত স্বরগুলোর সাহায্যে গানের কথা দিয়ে, রাগের রূপ ঠিক রেখে আরোহী, অবরোহী, বাদী সমবাদী যাবতীয় নিয়ম বিবেচনা করে লয়ের সঙ্গে রাগের রুপ গেয়ে দেখানোকেই “বিস্তার” বলা হয়।

১০৩। বহলাবাঃ আলাপের ঢংয়ে পরিবেশিত তান এবং বোলতানকে বহলাবা বলা

১০৪। বোল বিস্তারঃ বাণীর সাহায্যে বিস্তারের নাম বোল বিস্তার। হয় ।

১০৫। বাটঃ গানের কথার সাহায্য রাগের শুদ্ধতা রক্ষা করে দ্বিগুন, তিনগুণ অথবা চৌগুণ ইত্যাদি বিভিন্ন ছন্দে গাওয়াকে “বাঁট” বলে । ধ্রুপদে তান ব্যবহার হয় না বলেই ধ্রুপদে বঁটি আবশ্যিক । তবে খেয়ালে বাঁট ও তান উভয়ই ব্যবহৃত হয়।

১০৬। কম্পনঃ কোন স্বর দুলিয়ে উৎপন্ন হলে তাকে কম্পন বলে । কম্পনে কোন বিশেষ স্বর দুলিয়ে দুলিয়ে উৎপন্ন হয় অর্থাৎ একই স্বর পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করলে কম্পনের সৃষ্টি হয় । যেমন- সাসাসা, রারারা ইত্যাদি।

১০৭। আন্দোলনঃ দুটি জিনিষের পরস্পর সংঘর্ষের ফলে আহত জিনিসটি স্থানচ্যুত হয়ে এপাশ ওপাশ দুলতে থাকে এবং ইহার ফলে বায়ুমন্ডলে যে তরঙ্গের সৃষ্টির হয় তাকে আন্দোলন বলে। ধ্বনি সৃষ্টি কম্পন বা আন্দোলন থেকে।

যদি কোন বাদ্য যন্ত্ৰ তারে আঘাত করা হয় তবে আন্দোলনের সৃষ্টি হবে। আর তখনই ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে। আর যখন তারের উপর আঘাতের শক্তি কম হবে, তখন তারটি উপর নীচে ওঠা নামা কম করবে এবং কম্পনও কম হবে। আর কম্পন থেমে গেলে আর ধ্বনি শুনা যাবে না। এক সেকেন্ডের মধ্যে আন্দোলনের সংখ্যা যত বেশী হবে ধ্বনিও তত জোরে হবে। আন্দোলন ৪ প্রকার। যথাঃ

১। নিয়মিত আন্দোলনঃ যে আন্দোলনের গতিবেগ সমান থাকে তাকে নিয়মিত আন্দোলন বলে ।

২। অনিয়মিত আন্দোলনঃ যে আন্দোলনের গতিবেগ সমান থাকে না তাকে অনিয়মিত আন্দোলন বলে ।

৩। স্থির আন্দোলনঃ যে আন্দোলনের স্থায়িত্ব কিছু সময় থাকে অর্থাৎ আন্দোলিত হওয়া মাত্রই থেমে যায় না তাকে স্থির আন্দোলন বলে ।

৪। অস্থির আন্দোলনঃ যে আন্দোলন স্থায়িত্ব বেশী সময় থাকে না, আন্দোলিত হওয়া মাত্রই থেমে যায় তাকে অস্থির আন্দোলন বলে।

১০৮। ছুট্‌ঃ কোন একটি স্বর হতে দূরবর্তী অন্য আর একটি স্বরে হঠাৎ যাওয়াকেই বলে। যেমনঃ সগা, সমা, সপা ইত্যাদি

১০৯। থমঃ লয়ের সাথে সুরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিশ্রাম স্থায়িত্বের নামকে “খম” বলে ।

১১০। দমঃ গাইবার সময় লয়সহ কোন স্বরে অধিকক্ষণ (স্থায়িত্ব) দাঁড়ানোকে “দম” বলে ।

১১১। অনিবদ্ধ গানঃ প্রাচীনকালে গানের রচনা বা বন্দিশের আলাপকে “অনিবদ্ধ গান” বলা হতো । এই গান তালযন্ত্র ছাড়া বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত লয়ে গাওয়া হতো।

১১২। নিবন্ধ গানঃ প্রাচীনকালে সুর, তাল ও লয়যুক্ত গানের রচনা বা বন্দিশকে “নিবদ্ধ গান” বলা হতো ।

১১৩। মার্গ সঙ্গীতঃ মার্গ সঙ্গীত অত্যন্ত প্রাচীন। বিশেষ বিশেষ নিয়ম অনুসারে যে সকল রাগ পরিবেশন করা হয় তাকে মার্গ সঙ্গীত বলে । খ্রীস্টপূর্ব যুগে বৈদিকগান, সামগান থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে যে অভিজাত গানের সৃষ্টি হয়ে তাকে মার্গ গান বা মার্গ সঙ্গীত বলে । মার্গ শব্দের অর্থ অনুসরণ করা, অন্বেষণ করা। বর্তমান ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতকে মার্গ প্রকৃতি সম্পন্ন সঙ্গীত বলা যেতে পারে।

১১৪। দেশী সঙ্গীতঃ যে সকল রাগ পরিবেশনে কোন ধরা বাঁধা নিয়ম নেই এবং বিভিন্ন টং এ বাজানো বা গীত হয়, তাকে দেশী সঙ্গীত বলে ।

১১৫। গায়কীঃ সঙ্গীতের প্রয়োগ কলায় নিজ মৌলিকত্ব তথা ব্যক্তিত্বের প্রকাশকেই বলা হয় গায়কী।

১১৬। নায়কীঃ সঙ্গীতের বিশুদ্ধ অবিকৃতরূপে প্রকাশ করাকেই নায়কী আখ্যা দেওয়া হয়। ‘নায়কী’ গান অর্থে বোঝায় যে গুরু পুরস্পরায় প্রাপ্ত সঙ্গীতের বন্দেজী যথাযথভাবে বাণী, স্বর এবং তাল সহযোগে প্রকাশ করা ।

১১৭। পন্ডিতঃ সঙ্গীত শাস্ত্রে পারদর্শী তথা জ্ঞানী এবং ক্রিয়াত্মক অংশে মোটামুটি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকেই সঙ্গীতের ভাষায় ‘পন্ডিত’ বলা হয়।

১১৮। গায়কঃ গুরুর কাছে যথারীতি শিক্ষার পর সেই গুরুমুখী বিদ্যার উপর নিজস্ব প্রতিজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, পান্ডিত্য, রসবোধ ইত্যাদির দ্বারা যিনি নতুন বৈশিষ্ট্য আরোপ করতে পারেন, তাঁকেই বলা হয় গায়ক।

১১৯। নায়কঃ শাস্ত্রীয় ও ব্যবহারিক উভয় সঙ্গীতে যিনি সমান দক্ষ, নতুন নতুন রচনায় যিনি পারদর্শী, তাঁকে নায়ক উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১২০। বিদারীঃ গান কিংবা আলাপের ছোট বড় বিভাগগুলোকে প্রাচীনকালে, বলা হতো বিদারী। গীতের অবয়বগুলোর উপ-বিভাগকেও বিদারী বলা হতো।

১২১। ধাতুঃ আজকাল যেমন কোন একটি গানের কবিতাকে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও অভিভাগ এই চারটি স্তবকে ভাগ করা হয়। কিন্তু প্রাচীনকালে সেই স্তবকগুলোকে বলা হচ্ছে ধাতু। সেই পাঁচ রকম ধাতুর নাম- উর্দূগ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব, অন্তরা ও আভোগ ১২২। আক্ষিপ্তিকাঃ সঙ্গীতের মধ্যে যা স্বর, তাল ও শব্দ দ্বারা রচিত, তাকে বলা হয় আক্ষিন্তিকা । ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল প্রভৃতি সবই আক্ষিপ্তিকা

১২৩। ধ্বনিঃ সঙ্গীতের উৎপত্তি শব্দ বা ধ্বনি থেকে। আর ধ্বনির উৎপত্তি দুইটি জিনিসের সংঘর্ষ বা সংঘাত থেকে। অর্থাৎ কোন জিনিসের সংঘর্ষ বা সংঘাত থেকে যে আন্দোলন বা কম্পন হয়, তা থেকে, ধ্বনির উৎপত্তি। ধ্বনি দুই প্রকার যথা- মধুর ধ্বনি ও কর্কশ ধ্বনি। মধুর ধ্বনি হলো নাদ এবং কর্কশ ধ্বনি হলো কোলাহল ।

১২৪। স্থানঃ স্থান অর্থ জায়গা। সঙ্গীতে দেখা যায় যে, কখনও উচ্চগ্রামে আবার কখনও নিম্নগ্রামে স্বর প্রয়োগ হচ্ছে। স্বরের এই উঠা-নামা তিনটি স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ । স্বরের উঠা-নামার এই ক্ষেত্রে বা জায়গাকে স্থান বলে। এই তিনটি স্থান ‘নাদ স্থান’ নামে পরিচিত। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানের নাম যথাক্রমে উদারা, মুদারা ও তারা ।

১২৫। স্বরাবর্তঃ সাগাম বা স্বরমালিকার আরেক নাম সুরাবর্ত। স্বরের প্রয়োগ স্বরের একটা আবর্ত আছে বলেই তাকে সুরাবর্ত বলা হয়।

১২৬। রাগালাপঃ আলাপে রাগের গ্রহ, অংশ, ন্যাস, অপন্যাস; সন্ন্যাস, বিন্যাস, অপত্ব, বহুত্ব, মন্ত্র ও তার এই দশটি নিয়ম পালিত হলে তাকে রাগালাপ বলে ।

১২৭। রুপকালাপঃ প্রাচীনকালের প্রবন্ধ গানের বৈশিষ্ট্যগুলো যে আলাপে ফুটিয়ে তোলা হতো আভাসে ইঙ্গিতে, তাকে বলা হতো রুপকালাপ । এটি রাগালাপের পরবর্তী পর্যায় ।

১২৮। আলপ্তি গানঃ অনিবদ্ধ গানেরই একটি প্রকার আলপ্তি গান। এই আলাপে রাগের পূর্ণ অংশ প্রকাশিত হতো। তাছাড়া রাগের অবির্ভাব-তিরোভাব ঘটিয়ে এই আলাপের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখান হতো। রাগালাপ ও রুপকালাপের পর গাওয়া হতো আলপ্তি ।

১২৯। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতঃ ধ্রুপদ খেয়াল, টপ্পা, ঠুংরী প্রভৃতি বোঝাতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত কথাটির ব্যবহার দেখা যায়। উচ্চ অঙ্গের সঙ্গীত, এই অর্থে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। যে সঙ্গীত গঠনে, রূপায়ণে ও রস সম্পাদনে প্রচলিত অন্যান্য সঙ্গীত ধারা থেকে উচ্চ তারই নাম উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ।

১৩০। কলাবন্তঃ যে সঙ্গীতকার ঘনিষ্ঠ অনুশীলনের মাধ্যমে ক্রিয়াত্মক সঙ্গীতে সিদ্ধি লাভ করেন তাঁকে কলাবন্ত বা কলাকার বলা হয়। মধ্যযুগে যাঁরা ধ্রুপদ গাইতেন ও বীণা বাজাতেন তাঁদের কলাবস্তু বলা হতো। সম্রাট আকবরের সময় থেকে কলাবন্ত কথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে বলে জানা যায় ।

১৩১। কোরাসঃ কয়েকজন মিলে গান গাইলে কোরাস হয়। কথাটি পাশ্চাত্য সঙ্গীত থেকে আমাদের সঙ্গীত ধারায় জনপ্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্মেলক গান বা বৃন্দ গানের পাশ্চাত্য পরিভাষা। কোরাস দল শুধু পুরুষ বা শুধু নারী দ্বারা গঠিত হতে পারে। আবার নারী পুরুষ উভয় মিলেও হতে পারে ।

১৩২। চলনঃ রাগ পরিবেশনের সময় রাগের রুপ প্রকাশের ধারাকে বলা হয় চলন। যন্ত্র বাদনেও চলন বা চাল কথাটি ব্যবহৃত হয়।

১৩৩। বৃন্দঃ বৃন্দ হলো সম্মিলিত সঙ্গীত। সম্মিলিত কন্ঠ সঙ্গীতকে বলা হয় বৃন্দগান বা বৃন্দগীতি। সম্মিলিত যন্ত্রবাদনকে বলা হয় বৃন্দ বাদন বা বাদ্যবৃন্দ। শাঙ্গদের “সঙ্গীত রত্মাকর” গ্রন্থে তৎকালীন বৃন্দ গঠন সম্পর্কে তিন প্রকার বৃন্দের কথা বলেছে যথাঃ

১) উত্তম বৃন্দঃ ৪ জন মুখ্য গায়ক, ৮ জন সমগায়ক বা সহকারী গায়ক, ১২ জন গায়িকা, ৪ জন বংশী বাদক ও ৪ জন মৃদঙ্গ বাদক সমবায়ে উত্তম বৃন্দ গঠিত হয় ।

২) মধ্যম বৃন্দঃ ২ জন মুখ্য গায়ক, ৪ জন সমগায়ক বা সহকারী গায়ক, ৬ জন গায়িকা, ২ জন বংশী বাদক ও ২ জন মৃদঙ্গ বাদক সমবায়ে মধ্যম বৃন্দ গঠিত হয় ।

৩) কনিষ্ঠ বৃন্দঃ ১ জন মুখ্য গায়ক, ৩ জন সমগায়ক বা সহকারী গায়ক, ৪ জন গায়িকা, ২ জন বংশী বাদক ও ২ জন মৃদঙ্গ বাদক সমবায়ে কনিষ্ঠ বৃন্দ গঠিত হয়। কোন বৃন্দে উত্তম বৃন্দ অপেক্ষা অংশ গ্রহণকারীর সংখ্যা বেশী হয় তবে তাকে কোলাহল বৃন্দ বলা হয়। এই বৃন্দকে বলা হয়েছে গায়ক বৃন্দ ।

১৩৪। বৈতালিকঃ বৌদ্ধ যুগে জাতক বা প্রচলিত গাঁথাকে গানের মাধ্যমে যাঁরা পরিবেশন করতেন তাদেরকে বৈতালিক বলা হতো। ১৩৫। মাতুঃ গানের ভাষাকে প্রাচীন শাস্ত্রে মাতৃ বলা হতো ।

১৩৬। বঢ়তঃ গান বা বাজানোর সময় ধীরে ধীরে লয় বাড়িয়ে নিয়ে সরগম, বোলতান, গমক ইত্যাদির প্রয়োগকে সামগ্রিকভাবে বঢ়ত বলা হয় ।

১৩৭। মুখ চালনঃ রাগ পরিবেশনের সময় গমক ও মীড় যুক্ত অলঙ্কারের সাহায্যে স্বর বিস্তারের ক্রিয়াকে মুখ চালন বলা হয় ।

১৩৮। মূর্কীঃ মূর্কী এক প্রকার গমকের নাম। মতান্তরে তিন স্বরের এক অর্ধবৃত্তি দ্রুত উচ্চারিত হলে মূকী হয়। তবে এই তিন স্বরের মধ্যে একটি থাকে প্রধান স্বর দুটি থাকে স্পর্শ স্বর । স্পর্শ স্বরের ব্যবহারই মূকী নামে খ্যাত।

১৩৯। বাজঃ বাজাবার বিশেষ রীতিকে বাজ বলা হয়। যেমন, মজিদখান বাজ, রেজাখানি বাজ ইত্যাদি ।

১৪০। যুগলবন্দঃ একজন যদি গান করেন আর সেই সঙ্গে আর একজন যদি সেই গানের সরগম প্রথম জনের সমান লয়ে গেয়ে যান তাহলে এই দ্বৈতগীতিকে যুগলবন্দ বলা হয়।

১৪১। রসঃ যে বাহ্যবস্তু বা গুণের আস্বাদনে দেহ বা চিত্তের স্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে বা বিকৃতি ঘটে বা ভাবান্তর উপস্থিত হয় তাকে বলা হয় রস।

১৪২। রাগ সঙ্গীতঃ যে সঙ্গীত ধারার কেন্দ্রে রয়েছে রাগ রুপায়ন তাকে রাগ সঙ্গীত বলা হয়ে থাকে । ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুংরী প্রভৃতি রাগ সঙ্গীত।

১৪৩। বক্তরাগঃ যে রাগে আরোহী বা অবরোহী বা উভয় ক্রমেই বক্রস্বরের প্রয়োগ বেশী তাকে বক্ররাগ বলে। বক্ররাগে ব্যবহৃত স্বরসমূহ স্বাভাবিকক্রম অনুযায়ী সরল গতিতে আরোহী বা অবরোহীতে প্রযুক্ত হয় না ।

১৪৪। অধম রাগঃ অধম রাগ মানে অতি সঙ্কীর্ণ রাগ। যে রাগ বিস্তৃত আলাপের অযোগ্য এবং যা দ্বারা সবিস্তার ভাব প্রকাশ করা যায় না তাকে অধম রাগ বলে।

১৪৫। স্বরবিস্তারঃ রাগের রুপ প্রকাশক ধীর গতি সম্পন্ন স্বর উচ্চারণকে স্বরবিস্তার বলে। স্বরবিস্তার সর্বদাই ধীর লয়ে সম্পন্ন হয় ।

১৪৬। স্বরসম্বাদঃ দুই বা তার বেশী সংখ্যক স্বরকে এক আঘাতে বাজালে বা একই সঙ্গে গাওয়ার প্রক্রিয়াকে স্বরসম্বাদ বলা হয়। স্বরসম্বাদ কর্ডকেও বুঝিয়ে থাকে।

১৪৭। স্বরাস্তরঃ দুই স্বরের মধ্যবর্তী ব্যবধানকে বা অন্তরকে স্বরান্তর বলা হয়। ইন্টারভ্যাল বলতেও স্বরান্তর বোঝায় ।

১৪৮। আখরঃ আখর হচ্ছে কীর্তন পরিবেশনের অঙ্গ অর্থাৎ কথার তান। কীর্তনের পদবাহিত ভাবকে কীতনীয় তাঁর রচিত কথার সাহায্যে মূর্ত করে তুললে আখর হয়। আখর রচনাকে সে জন্যে পদের ব্যঞ্জনা প্রকাশক পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে।

পদ গাইবার সময় কীর্তনীয়া স্থানে স্থানে পদবাহিত ভাবকে অবলম্বন করে স্বয়ং কাব্য ও গদ্য ছন্দে কিছু রচনা করে গেয়ে শোনান তারই নাম আখর ১৪৯। কৰ্ত্তবঃ গীতে স্বর কৌশল প্রদর্শন করাকে কর্তব বলা হয়

১৫০। উপজঃ গীতে ছোট ছোট তান নেয়ার নাম উপজ ।

১৫১। জমজমাঃ জমজমা অর্থ কোন স্বরকে আন্দোলিত করা। সেতার বাদনে দু’টি স্বরকে দ্রুত একের পর এক করে বাজানোকে ‘জমজমা’ বলা হয়

১৫২। জোড়ঃ আলাপের শেষাংশে বা আভোগকে ‘জোড়’ বলা হয়। এই অংশে আলাপের গতি দ্রুত ও ছন্দোবদ্ধ হয়। জোড়ের পর দ্রুতলয়ে ঝালার কাজ করে আলাপ শেষ করতে হয় ।

১৫৩। অপেরাঃ এটা গীতি নাট্য। সঙ্গীত ও নাট্যকলার অপূর্ব সমন্বয়ে অপেরা রচিত হয়। অপেরায় থাকে একক, দ্বৈত ও সম্মেলক গান সহ নানা শ্রেণীর গান, কবিতা আবৃত্তি ও সংলাপ, অর্কেস্ট্রাসহ নানা ধরণের যন্ত্রবাদন, অভিনয় ও মুকাভিনয়, নৃত্য, দৃশ্য সজ্জা, অঙ্গসজ্জা প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ের বিপুল আয়োজন। এই বহুবিধ বিষয়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপনেই অপেরার শক্তি নিহিত থাকে ।

১৫৪ । কবিয়ালঃ কবির দলের মুখ্য গায়েনকে কবিয়াল বলা হয়। তিনি আসরে দাঁড়িয়ে তাঁর দল পরিচালনা করেন ও প্রতিপক্ষ দলের কবিয়ালের প্রশ্নের উত্তর দেন। গোজলা গুই আদি কবিয়াল রূপে অভিহিত হয়।

১৫৫। বন্দিশঃ বন্দিশ অর্থ বাঁধুনি বা বন্ধন । রাগের রুপরেখা প্রকাশের জন্য যে সকল স্মরসমষ্টি (নির্দিষ্ট আরোহন ও অবরোহন সম্বলিত) প্রবন্ধ গানে আস্থায়ী ও অন্তরায় ব্যবহৃত হয় তাকে বন্দিশ বলে ।

১৫৬। গতিঃ গানের চালকে গতি বোঝায়। গতি দুই প্রকার ।

ক) শুদ্ধ স্বরুপঃ যে রাগের স্বরসমষ্টি সরল ও শুদ্ধভাবে চলে তাকে শুদ্ধ-স্বরূপ গতি বলা হয়। যেমন- ভূপালী।

খ) বক্র-স্বরুপঃ যে রাগের স্বরসমূহ বক্র গতিতে চলে তাকে বক্র-স্বরূপ গতি বলা হয়। যেমন- গৌড় সারং ।

১৫৭। বিভ্রান্তিঃ বিভ্রান্তি মানে বিরতি। তান, আলাপ বা ছন্দের কাজে যে সকল স্থানে ছেদ ঘটে তাকে বিশ্রান্তি বলা হয়।

 

বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়
বিভিন্ন সপ্তকের স্বর চিনবার উপায়

 

১৫৮। উঠাওঃ যে স্বরসমষ্টি দ্বারা গান-বাজনা শুরু বলা হয় সেই স্বরসমষ্টিকে উঠাও বলা হয়। পকড় আর উঠাও কিন্তু এক নয়। পকড় হলো, রাগবাচক মুখ্য কয়েকটি স্বর মাত্র। আর উঠাও হলো, যে স্বরসমষ্টি দ্বারা আরেকটা আলাপের মতো করে রাগ ধরা হয়।

১৫৯। তারপরণঃ পাখোয়াজের পরণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাগবাচক স্বরসমূহ ব্যবহারকে তারপরণ বলা হয়। আলাপের শেষভাগে তারপরণ বাজানো হয় ।

১৬০। কসবীঃ উপযুক্ত গুরুর কাছ হতে শিক্ষাপ্রাপ্ত উপযুক্ত শিষ্যকে কসবী বলা হয় ।

১৬১ । অতাঈঃ যে শ্রুতিধর শিল্পী গুরুর কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত না হয়ে নানাভাবে গান ইত্যাদি শুনে নিজে গাইতে সমর্থ হন তাকে অতাঈ বলে ।

আরও দেখুন:

Leave a Comment