পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখী । শিল্পী জীবনী

পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখী (বা ব্যাঙ্কটমাখিন) দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী নাম, যিনি কর্ণাটক সংগীতের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে সুসংহত ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তাঁর জীবনকাল বিস্তৃত বলে ধারণা করা হয়। তিনি বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিসরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাঞ্জোর অঞ্চলে সংগীতচর্চা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখী । শিল্পী জীবনী

তিনি ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত ও রাষ্ট্রনায়ক গোবিন্দ দীক্ষিতের পুত্র। গোবিন্দ দীক্ষিত বিজয়নগরের রাজা রঘুনাথ নায়কের দরবারে মন্ত্রী (দেওয়ান) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মা নাগমাম্বিকা। এই উচ্চশিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে ব্যাঙ্কটমুখীর বেড়ে ওঠা তাঁর সংগীত ও শাস্ত্রচর্চার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর সংগীতগুরু হিসেবে তানপ্পাচার্যের নাম উল্লেখযোগ্য, যাঁর কাছে তিনি প্রাথমিক ও উচ্চতর সংগীতশিক্ষা লাভ করেন।

পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখীর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হলো তাঁর রচিত গ্রন্থ “চতুর্দণ্ডী প্রকাশিকা” (Chaturdandi Prakashika), যা আনুমানিক ১৬৩০–১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত। এই গ্রন্থটি দক্ষিণ ভারতীয় সংগীততত্ত্বের এক মৌলিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে তিনি সংগীতের চারটি প্রধান উপাদান—গীত, আলাপ, তান এবং প্রবন্ধ—এই ‘চতুর্দণ্ডী’ ধারণার ব্যাখ্যা দেন। তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ৭২ মেল (Melakarta) পদ্ধতির প্রবর্তন, যা আজও কর্ণাটক সংগীতের স্বরবিন্যাসের মূল কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই ৭২ মেল পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি স্বরের একটি বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস উপস্থাপন করেন। প্রতিটি মেল একটি সম্পূর্ণ স্বরসেট (সপ্তক) ধারণ করে এবং সেখান থেকে অসংখ্য রাগের উৎপত্তি সম্ভব। তাঁর এই পদ্ধতি সংগীতকে একটি সুসংহত ও যুক্তিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে কর্ণাটক সংগীতের রাগব্যবস্থা এই মেল পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয়। এ কারণে তাঁকে কর্ণাটক সংগীতের আধুনিক তাত্ত্বিক কাঠামোর অন্যতম প্রবর্তক বলা হয়।

ব্যাঙ্কটমুখীর পূর্বে দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের রূপ ছিল তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ও প্রথানির্ভর। কিন্তু তাঁর প্রবর্তিত মেলপদ্ধতি সংগীতকে একটি সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় রূপ দেয়। এই পরিবর্তনের ফলে তাঞ্জোর ও বিজয়নগর অঞ্চল কর্ণাটক সংগীতের নবযুগের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখী প্রাচীন সংগীতাচার্য শার্ঙ্গদেবের বংশধর ছিলেন বলে অনুমান করা হয়, যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ অপ্রতুল। তবে তাঁর সংগীততাত্ত্বিক গভীরতা এবং শাস্ত্রজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি প্রাচীন সংগীত ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে তথ্য সীমিত হলেও এটি জানা যায় যে, তিনি রাজদরবারে সভাগায়ক হিসেবে সম্মানিত ছিলেন এবং সংগীতচর্চার পাশাপাশি তাত্ত্বিক গবেষণায়ও সমানভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না, তবে অনুমান করা হয় যে সপ্তদশ শতকের শেষভাগে তাঞ্জোরে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

সব মিলিয়ে, পণ্ডিত ব্যাঙ্কটমুখী ছিলেন এমন একজন সংগীততাত্ত্বিক, যিনি দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে একটি সুসংহত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করেন। তাঁর ৭২ মেল পদ্ধতি এবং চতুর্দণ্ডী প্রকাশিকা গ্রন্থ আজও সংগীতচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। তাঁর অবদান শুধু তাঁর সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে কর্ণাটক সংগীতের বিকাশে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

Leave a Comment