শ্রীমতী আঙ্গুরবালা বাংলা সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশেষত নজরুল যুগের অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয়। কাজী নজরুল ইসলামের যে সকল প্রথিতযশা শিষ্য-শিষ্যা বাংলা গানে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আঙ্গুরবালার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, বরং নজরুল সঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে একনিষ্ঠ সাধিকা হিসেবে সারাজীবন কাজ করে গেছেন।

শ্রীমতী আঙ্গুরবালা । শিল্পী জীবনী
আঙ্গুরবালার প্রকৃত নাম ছিল প্রভাবতী দেবী। তিনি আনুমানিক ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলার ইন্দাসে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ লক্ষ করা যায়। তিনি ছাত্রবৃত্তি লাভ করে পড়াশোনায়ও সাফল্য অর্জন করেন, যা তাঁর মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচায়ক। কিন্তু তাঁর প্রকৃত ঝোঁক ছিল সংগীতের প্রতি, এবং সেই আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে নিয়ে আসে কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে।
নজরুলের কাছে সংগীত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর প্রতিভা, নিষ্ঠা এবং কণ্ঠসৌন্দর্যের জন্য নজরুলের বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন। কবি তাঁকে স্নেহভরে “নানি” বলে ডাকতেন—যা তাঁদের গভীর আত্মিক সম্পর্কের পরিচায়ক। নজরুলের তত্ত্বাবধানে তিনি বহু গান রেকর্ড করেন এবং সেই গানগুলির মাধ্যমে নজরুল সঙ্গীত সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর অসাধারণ কণ্ঠশৈলী শুনে অতি দ্রুত তাঁর গান রেকর্ড করার উদ্যোগ নেয়। তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু এবং বিশেষভাবে নজরুল সঙ্গীতে প্রায় চারশটিরও বেশি গান রেকর্ড করেন। তাঁর গায়কি ছিল মাধুর্যপূর্ণ, আবেগঘন এবং সহজে হৃদয়স্পর্শী—যা তাঁকে সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সংগীতবোদ্ধা সকলের কাছে প্রিয় করে তোলে।
শুধু সংগীতেই নয়, আঙ্গুরবালার প্রতিভা ছিল বহুমুখী। তিনি চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ অভিনয়েও দক্ষতার পরিচয় দেন। সেই সময় নারী শিল্পীদের জন্য অভিনয় ও সংগীতচর্চা সহজ ছিল না, কিন্তু তিনি সমস্ত বাধা অতিক্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে তিনি কেবল একজন গায়িকা হিসেবেই নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
তাঁর গানের মধ্যে ভক্তিমূলক, দেশাত্মবোধক, প্রেমমূলক এবং লোকধর্মী সুরের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিশেষ করে নজরুলের সুরারোপিত গানগুলিকে তিনি এমনভাবে পরিবেশন করতেন, যা গানগুলির আবেগ ও ভাবকে আরও গভীরভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিত।
জীবনের শেষ পর্বে তিনি কিছুদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগেছিলেন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি, শুক্রবার, ৮৪ বছর বয়সে কলকাতার দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণ বাংলা সংগীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে।
তবে মৃত্যুর পরেও তাঁর সংগীত আজও বেঁচে আছে। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডকৃত নজরুলগীতি ও অন্যান্য গান আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এবং সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর শিল্পসাধনা প্রমাণ করে যে, একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই চিরজীবী হয়ে থাকেন।
সব মিলিয়ে, শ্রীমতী আঙ্গুরবালা ছিলেন নজরুল যুগের এক অনন্য সাধিকা, যিনি তাঁর কণ্ঠ, নিষ্ঠা এবং শিল্পপ্রেমের মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং ইতিহাসে এক অমলিন স্থান অধিকার করে আছেন।