মহর্ষি ভরত । শিল্পী জীবনী

মহর্ষি ভরত ভারতীয় সংগীত, নাট্য ও নৃত্যকলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও প্রাচীনতম ব্যক্তিত্ব। তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ “নাট্যশাস্ত্র”, যা ভারতীয় নাট্য ও সংগীততত্ত্বের অন্যতম প্রাচীন ও ভিত্তিমূলক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এই গ্রন্থ কেবল নাট্যকলার জন্যই নয়, বরং সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, রসতত্ত্ব এবং মঞ্চকলার সমন্বিত এক বিশ্বকোষ হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

মহর্ষি ভরত । শিল্পী জীবনী

মহর্ষি ভরতের জন্মকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো মতে তিনি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন, আবার অন্য মতে তাঁর সময়কাল খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে। এমনকি “ভরত” নামটি একাধিক প্রাচীন পণ্ডিত বা শিল্পীর উপাধি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। ফলে তাঁর সুনির্দিষ্ট জীবনীসংক্রান্ত তথ্য সীমিত হলেও তাঁর রচিত নাট্যশাস্ত্র তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে।

“নাট্যশাস্ত্র” মূলত নাট্যকলার গ্রন্থ হলেও এর ২৮ থেকে ৩০ অধ্যায়ে সংগীত বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়। এখানে স্বর, শ্রুতি, গ্রাম, মূর্চ্ছনা, জাতি, তাল, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এই গ্রন্থেই প্রথম সংগীতকে একটি শাস্ত্রীয় ও পদ্ধতিগত রূপে উপস্থাপন করা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ভরত সংগীতের মৌলিক উপাদান—স্বর ও লয়ের মধ্যে সম্পর্ক এবং তার নান্দনিক প্রয়োগকে সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ভরতের আরেকটি অনন্য অবদান হলো “রসতত্ত্ব”। তিনি নাট্য ও সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মনে যে অনুভূতি বা আবেগ জাগ্রত হয়, তাকে “রস” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। শ্রঙ্গার, বীর, করুণ, রৌদ্র, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভুত—এই আটটি প্রধান রসের ধারণা তিনি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় সংগীত ও নাট্যকলার ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই রসতত্ত্ব আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অভিব্যক্তির মূল দর্শন হিসেবে বিবেচিত।

মহর্ষি ভরত সংগীতের ক্ষেত্রে “গ্রাম” ও “মূর্চ্ছনা” পদ্ধতির আলোচনা করেন, যা পরবর্তীকালে রাগসংগীতের বিকাশে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তিনি স্বরের সূক্ষ্ম বিভাজন অর্থাৎ “শ্রুতি”-র ধারণাও ব্যাখ্যা করেন, যা আধুনিক সংগীততত্ত্বের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কেও ভরত বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখিত দুটি বীণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—একটি সাত তারবিশিষ্ট “চিত্রাবীণা” এবং অন্যটি একুশ তারবিশিষ্ট “বিপঞ্চী বীণা”। এই বাদ্যযন্ত্রগুলির মাধ্যমে তৎকালীন সংগীতচর্চার উচ্চমান ও কারিগরি দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

উল্লেখযোগ্য যে, “ভরত” শব্দটি তৎকালীন সময়ে নাট্য ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্যও ব্যবহৃত হতো। “অমরকোষ” গ্রন্থে “নট” শব্দের সমার্থক হিসেবে “ভরত” শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে মহর্ষি ভরত শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী নাম হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেন।

পরবর্তীকালে বহু পণ্ডিত ও সংগীতজ্ঞ নাট্যশাস্ত্র-এর উপর ব্যাখ্যা ও টীকা রচনা করেছেন, যা এর গুরুত্ব ও প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য ও নাট্যকলার শিক্ষায় এই গ্রন্থ অপরিহার্য।

সব মিলিয়ে, মহর্ষি ভরত ভারতীয় সংগীত ও নাট্যকলার প্রাচীনতম তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেন। তাঁর চিন্তা, তত্ত্ব ও দর্শন হাজার বছর পরেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং প্রেরণাদায়ক। তিনি শুধু একজন গ্রন্থকার নন, বরং ভারতীয় শিল্পসংস্কৃতির এক চিরন্তন স্তম্ভ।

Leave a Comment