রাগ বিলাবল

রাগ বিলাবল হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাগ, যা শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। এটি বিলাবল ঠাটের আশ্রয়ী রাগ এবং সমস্ত শুদ্ধ স্বরের ব্যবহারের কারণে একে অনেক সময় “শুদ্ধ স্বরের আদর্শ রাগ” বলা হয়। এই রাগের স্বচ্ছতা, সরলতা এবং সুষম গঠন শিক্ষার্থীদের স্বরজ্ঞান ও রাগবোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

রাগটির জাতি সম্পূর্ণ–সম্পূর্ণ, অর্থাৎ এর আরোহী ও অবরোহী উভয়েই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়। বিলাবলের বাদী স্বর ধৈবত (ধা) এবং সমবাদী স্বর গান্ধার (গা), যা রাগটির স্বরবিন্যাসে একটি বিশেষ ভারসাম্য সৃষ্টি করে। এটি মূলত উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ, অর্থাৎ পা, ধা, না—এই ঊর্ধ্বাংশের স্বরগুলো এখানে অধিক প্রাধান্য পায়।

রাগ বিলাবলের প্রকৃতি শান্ত ও প্রশান্তিময়। এর স্বরচালনায় কোনো তীব্রতা বা অতিরিক্ত অলংকারের প্রয়োজন হয় না; বরং স্বরের সরল ও পরিষ্কার বিন্যাসেই এর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। ন্যাস স্বর হিসেবে ‘সা’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে এসে রাগের বাক্যগুলো স্থিতি লাভ করে।

এই রাগে সব স্বরই শুদ্ধভাবে ব্যবহৃত হয়—কোনো কোমল বা তীব্র স্বরের প্রয়োগ নেই। এর ফলে রাগটির একটি নির্মল ও উজ্জ্বল ধ্বনিসৌন্দর্য তৈরি হয়, যা দিনের প্রথম প্রহরের (সকালবেলা) আবহের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই প্রচলিত নিয়মে এই রাগ দিবা প্রথম প্রহরে পরিবেশন করা হয়।

রাগ বিলাবল

বিলাবল হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাগ। আধুনিক হিন্দুস্তানি সংগীতে ‘বিলাবল ঠাট’-কে শুদ্ধ স্বরগ্রামের আদর্শ (Standard Scale) হিসেবে ধরা হয়। এটি অত্যন্ত প্রশান্ত এবং ভোরের স্নিগ্ধতা বহন করে।

১. তাত্ত্বিক পরিচয় (Technical Details)

  • ঠাট: বিলাবল (এটি বিলাবল ঠাটেরই প্রধান রাগ)।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহী ও অবরোহী উভয় ক্ষেত্রেই ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধা)।
  • সমবাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
  • অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ (যেহেতু বাদী স্বর ‘ধা’ সপ্তকের উত্তর অংশে অবস্থিত)।
  • প্রকৃতি: শান্ত ও গম্ভীর।
  • ন্যাস স্বর: ষড়জ (সা)। এর পাশাপাশি ‘গা’ এবং ‘পা’-তেও ন্যাস বা বিরতি নেওয়া হয়।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।

 

২. স্বরলিপি ও চলন (Structure)

এই রাগে সবগুলো শুদ্ধ স্বর ব্যবহার করা হয়।

  • আরোহী: সা, রা, গা, মা, পা, ধা, না, র্সা।
  • অবরোহী: র্সা, না, ধা, পা, মা, গা, মা, রা, সা।
  • পকড় (রাগের মূল রূপ): গরা, গপা, মগা, মরা সা।

 

৩. বিশেষ ব্যাখ্যা (Analysis)

১. শুদ্ধ স্বরের আদর্শ: বিলাবল রাগে কোনো বিকৃত (কোমল বা তীব্র) স্বর নেই। তাই একে পাশ্চাত্যের ‘Major Scale’-এর সাথে তুলনা করা যায়। ২. উত্তরাঙ্গ প্রাধান্য: যেহেতু বাদী স্বর ‘ধা’, তাই গায়কিতে তার সপ্তকের কাজ এবং ওপরের দিকের স্বরবিন্যাস বেশি প্রাধান্য পায়।

৩. প্রকৃতি: এটি একটি প্রাতঃকালীন রাগ। ভোরের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মনের যে প্রশান্তি ও নতুন দিনের সতেজতা, তাই এই রাগের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।

 

আলাপ ও স্বরবিস্তারঃ

১। সারা গা মা গা পা মা গা মা রা, গা পা ধা পা মা গা মা রা গা মা পা মা গা মারা সা, সারা সা না ধা পা ধা না সা, সারা গা মা রা সা

২। সারা গা মা রা সা গা মা পা গা মা রা সা গা পা ধা না ধা পা গা মা পা মা গা মা রা, গা পা ধা না সা না ধা পা ধা মা গা মা রা, গা মা পা গা মা রা সা।

৩। গা পা ধা না সা-, না ধা না সাঁ, ধা না সা-, না ধা পা ধা মা গা সা রা র্সা না ধা-, না ধা পা ধা মা গা মা রা, গা মা পা মা গা মা রাসা।

৪। পা পা ধা না সা- সারা সা-, সারা গা মা র্রা সা সা না ধা না সা না ধা-পা, ধামা গামারা, গা মা পা ধা পা মা গা মা রা, গা পা ধা না সাঁ ।

রাগ – বিলাবল । সার্গামগীত। তাল-ত্রিতাল ॥

জনক রাগের পরিচয়সহ সার্গামগীত,লক্ষণগীত,তারানা,ছোট খেয়াল ও বড় খেয়াল

 

| রাগ-বিলাবল । লক্ষণগীত। তাল ত্রিতাল ॥ স্থায়ীঃ সব সুর শুদ্ধ জান ঠাট রাগ বিলাবল, শাস্ত্রমতে অষ্টভেদ শুদ্ধ ইহা কেবল । অন্তরাঃ ধা-গা বাদী সমবাদী উত্তরাঙ্গ প্রবল, দিবা প্রথম প্রহরে গাহে গুণী সকল ।

 

জনক রাগের পরিচয়সহ সার্গামগীত,লক্ষণগীত,তারানা,ছোট খেয়াল ও বড় খেয়াল

 

তানঃ ৮ মাত্রার

১। সরা গরা গমা পা । মগা মরা সরা সা

২। সরা গরা গা ধপা । মগা মরা সরা সা

৩। সরা গরা গযা গযা । পধা পদ্মা গমা রসা ।

৪। সরা গমা পধা না । নধা পদ্মা গমা রসা।

তানঃ ১৬ মাত্রার

১। সরা গমা পমা গরা। গমা পধা নধা পদ্মা। পধা না বা নধা । পমা গমা রসা সা ।

২। সরা গরা গপা মগা। মরা সা সরা গরা । গপা ধনা সর্বা সনা । ধপা মগা মরা সা

॥ রাগ-বিলাবল । খেয়াল । তাল ত্রিতাল ॥

স্থায়ীঃজাগ উঠে সব জন তুম জাগো, গৌ বনকে চরবালে চরৈয়া । অন্তরাঃ গাল বাল সব গৌবা চরাবত, তুমরে কারণ আবত ধাবত, সদারঙ্গ মন তুমসোঁ লাগো ।

জনক রাগের পরিচয়সহ সার্গামগীত,লক্ষণগীত,তারানা,ছোট খেয়াল ও বড় খেয়াল

 

তানঃ ৮ মাত্রার

১। সরা গপা ধপা নধা সেনা ধপা গমা রসা। ২। পপা ধপা সনা রসা । নধা পদ্মা গমা রসা।

৩। ধনা সর্রা পধা না । গমা পদ্মা গমা রসা।

৪। গরা সর্বা ধনা সর্না। ধপা মগা মরা সা

তানঃ ১২ মাত্রার

১। সরাগগা রগা পপা । নধা ননা ধনা সর্সা । না পদ্মা গমা রসা।

২। গমা রসা পধা নর্সা । গরা সর্বা সনা ধপা । নধা পদ্মা গমা রসা।

তানঃ ১৬ মাত্রার

১। সরা গরা গপা নথা। সনা রসা নধা পথা । গমা রসা গপা ধনা। সা পা ধা সা । ২। ধপা ধপা সনা রসা । গর্গা রর্সা নর্সা র্রর্সা। নধা পমা ধপা মগা । পমা গমা রসা সা ।

বোল তানঃ

১। সনা ধনা রা গরা। সনা ধপা গমা -রসা। 

২। সরা-গপা রগা-পধা। গপা-ধনা পধা নসা। মর্গা-রসা না-পদ্মা। গপা-মগা মরা-সা। 

। রাগ-বিলাবল । তারানা। তাল একতাল |

স্থায়ীঃ দীম্‌ তানানানা তাদিয়ানা দেরে না দের দের না দের দের, ওদিয়ানা তেরে ।

অন্তরাঃ নানা দেরে নানা দীর্ঘ তা নানানা, ধিতাং ধিতাং ওদিয়ানা তেরে ।

জনক রাগের পরিচয়সহ সার্গামগীত,লক্ষণগীত,তারানা,ছোট খেয়াল ও বড় খেয়াল

 

Leave a Comment